বাবা

আমরা সাত জন ভাই বোন নিয়ে দ্বিখণ্ডিত ভারতবর্ষে বাড়ি ছেড়ে মা আশ্রয় নিয়ে ছিল পশ্চিমবঙ্গে । বাবা রয়ে গিয়েছিলো পূর্ব বঙ্গে এবং মাটি আগলিয়ে আর  উপার্জন বাঁচাতে। বড়দা  পেয়েছিলো একটা কাজ নতুন ভারতের নতুন শিল্প রেল ইঞ্জিন বানানোর কারখানাতে চিত্তরঞ্জনে । আমাদের জীবন ধারনের জন্য উপযোক্ত অবশ্যই নয়। বাবা টাকা পাঠাত লোক মাধ্যমে যখন যা সম্ভব। বাবা মাকে খুব ভালো ও শ্রদ্ধা করতো। মা ও বাবাকে ভালো বাস্ত খুব। বড়দা  ছিল নাবালক। আঠেরো বছর বয়েসে চাকরিতে ঢুকে অনেক নেশা হয়ে গিয়েছিলো। একটা থেকে আর একটা। অভাবের তাড়নায় ভাবতো কি ভাবে একটু বেশি পয়সা কামানো যায় । যেটা চিত্তরঞ্জন সম্ভব নয় । তাসের জুয়া  ছাড়া। ধার হতে লাগলো আর হন্নে  হয়ে সে টাকার জন্যে কলকাতা যেতে থাকলো। স্বভাব নষ্ট হলো কিন্তু টাকা আর হলোনা। ব্যাবসার জন্যে কিছু টাকার জন্যে শেষ পর্যন্ত চাকরি ছেড়ে কলকাতায় হাজির হলো। আমাদের কোয়াটারের বাড়ী ছেড়ে  অন্যদের বাড়ি যেতে হলো। বাবা পাঁচ বার এসে আমাদের সাথে চিত্তরঞ্জন এসে থেকে ছিল। আমি ছিলাম বাড়ির ছোট। আমার দায়িত্ব ছিল ধার করা। আমার খুব লজ্যা লাগতো আমাদের দারিদ্রতা। যা করতে বা বলতে আমার হয়তো পাঁচ মিনিট লাগার কথা আমার লাগতো এক ঘন্টা।

সম্মানের কিন্তু অভাব হয়নি। আমি গিয়ে ধার শোধ দিতাম প্রতি মাসে। চরিত্রের ও অভাব হয়নি। আমরা কেও চোর বা মিথ্যেবাদী হয়নি। সোনাদা  বড়দা  কাক্কুর বাড়ি তে অনেকদিন ছিল। তাদের খরচ মা নিজের গয়না দিয়ে মিটিয়ে দিয়েছে। মা কখনোই আমাদের দেয়নি মাটি থেকে টাকা কুড়াতে বা কেও লজেন্স দিলেও নিতে। আমাদের বাড়ন ছিল কিছু কারোর কাছ থেকে নেওয়া।

বাবার দেখেছি ত্যাগের শরীর । পরিবারের উপর প্রচুর গর্ব ছিল। কিন্তু পরিবারে সবসময় সংকুচিত ভাবেই ছিল। জামা কাপড় কিছু পড়তই না। শুধু মার্ কাছে একটু চা বা ধূমপানের জন্য চাইতো তাও যত সামান্য। মাকে  দিয়ে মাঝে মাঝে চিঠি লেখাতো বন্ধুদের, সবার ঠিকানা ছিল মনে। বাইরে গিয়ে বসে কাগজ পড়তো আর কোনো কাওকে ডেকে গল্প করতো। আমাদের থেকে যত সম্ভব দূরে থাকতো।

বাবার প্রাণের কথা হতো দাদার সাথে। ঘন্টার পর ঘন্টা।

আমি কখন  পূর্ব বঙ্গে যায়নি আমার কোনো ধারণাই নেই। বাবা মারা যাবার পর দু চার বছর পরে আমার সাথে এক বৃদ্ধ লোকের দেখা হয়েছিল এক মেসের চিলেকোঠায়  তিনি আমার দেশের পরিচয় জিজ্ঞেস করলো। তিনি যৌবনকালে বাবা বন্ধু ছিলেন এবং কিশোরগঞ্জে থাকতেন। তখন নাকি বাবা নাকি সৌখিন সুপুরুষ ছিলেন। বাবা নাকি কলকাতা থেকেও একটা চিঠি লিখেছিলেন। বাবা যখন চিত্তরঞ্জন থাকতো তখন কিছু বন্ধু চিঠি দিয়ে ডেকে আনতো । বাবা খুব গল্প করতে ভালো বাস্ত । সুখের ব্যাপার যে বাবা জীবনের শেষ কয়েকটা বছর মার্ সাথে কাটিয়ে গেছে।

আমি একদিনের জন্যে বাড়িতে ছিলাম না। দিঘা গেয়েছিলাম। সন্ধে বেলা বাবা শুয়েছিল। মা বললো শরীর  অসুস্থ্য। আমি খুব ক্লান্ত ছিলাম। গভীর রাত্রে ছোড়দা বললো বাবা মারা গেছে। উঠে দেখি বাবা ঢোক খাচ্ছে। আমি ব্যস্ত হয়ে ডাক্তার ডাকতে গেলাম। ডাক্তার এলো না। বললো বাবার স্ট্রোক হয়েছে। সকাল বেলা এসে ডেথ সার্টিফিকেট নিয়ে যেতে।

আমি ৭১ এ বাবাকে নিয়ে এসেছিলাম শিলং থেকে। বাবা পছন্দ করতো না মেয়েদের উপর জোর করে  কথা বলা। কিন্তু সোনাদা ছিল বদরাগী। আর কিছু মাত্র অপব্যয় সহ্য করতে পারতো না। বাজার করে এসে এক টি ন কেরোসিন উল্টে দিয়ে খুব চেঁচামিচি আরম্ভ করলো বৌদির উপরে। বাবা বললো চুপ করতে। কিন্তু সোনাদা শুনবার নয়। আরম্ভ হলো বাবার উপর তড়পানি। তার পর থেকে তাদের আর কথা হয়নি। সোনাদার সাথে ছোড়দার কথা বন্ধ হয়েছিল শিলংয়েই, দাবা খেলা নিয়ে। সোনাদা  হারতে জানতো না। যখনি হেরে যায় তখনি সব দা ন ফেরত নেবেই। কখনো ৩০ দান বা বেশি। ছোড়দা আবার খুব নিয়মের বশ । তারপর থেকে আর তাদের কথা হয়নি বেঁচে থাকা কালীন। সোনাদার সাথে ভীষণ মন কসা  কসি হয়েছে দাদার সাথে। দাদার এক টি শান্ত ও দেওয়ার স্বভাব। মা শ্রাদ্ধের সময় ওর দিদির বিয়ের সময় আবার সোনাদা আরম্ভ করেছিল খোটা দেওয়া। সোনাদাকে সব সময় জিততেই হবে। সে হারবার উপায় নেই । বড়দার সাথে কখন লাগতে পারেনি অনেক চেষ্টা করেও। বড়দা তোরি জিৎ বলে ঘুমিয়ে পড়তো।

বাবা আর মা রাম ঠাকুরের কাছে এক সাথে দীক্ষা নিয়ে ছিল। বছরে কয়েকবার কিছু নারকোলের গুঁড়ো প্রাসাদ হিসাবে আস্ত পোস্টে। মা বই আর ম্যাগাজিন পড়তে ভালোবাসতো। বাবা কাগজ নিয়ে বসতো । মা মিথ্যে কথা পছন্দ করতো না। আমি মা কে  মিথ্যা কথা বলতে শুনিনি। আমার বোনেরা এই গুন কিন্তু পায়নি । মার ছিল অফুরন্ত ভালোবাসা। পাড়ার ছেলেরা সবাই ছিল মার ভক্ত। মা কে কখনো ঝগড়া করতে দেখিনি। দিদিমা শুনেছি বিজয় কৃষ্ণর দীক্ষিত। দিদিমা আর দাদু প্লানচেটে দীক্ষা নিয়ে ছিল। বিজয় কৃষ্ণ ছিল ব্রাহ্ম। মা ও দিদিমা গীতা পড়তো। বাবাকে পুজো আর্চা করতে দেখিনি। চান করে এসে ঠাকুর কে প্রণাম করতো। খাবার সময় ঠাকুর কে খাবার আর জল উত্তস্রগো করতো। বাবার একটা রোগ ছিল, অর্শ । তাতে মাঝে মাঝে কষ্ট পেতো। বাবার কবিরাজিতে  ছিল বিশ্বাস। আর ছিল মা  আর গুরুদেবে বিশ্বাস। আমার ছেলে মেয়েরা আমার বাবা মার নাম পর্যন্ত জানে না।

মা আধ্যাতিক ব্যাপারে অনেক এগিয়ে ছিল। মা মন্ত্র জপ করতো। প্রচুর পড়তো মহাপুরুষদের কথা রামায়ণ মহাভারত। মা সুযোগ মত ধ্যান করতে খুব ভোরে বিছানা ছাড়ার আগে। সব শোবার পরে। মার্ স্থির মস্তিস্ক্য ছিল। আর ছিল পরিমান জ্ঞান। মা ছিল সল্প ভাসি। কখনো কোনো কারণে মুখ খারাপ করতো না। কমে  রাজি ছিল। আমি প্রচুর মার্ খেয়েছি তবে আমার পথ থেকে কখন বিচ্যুত হয়নি। আমার পক্ষে ত্যাগ করা কঠিন ছিল না। আমার মিথ্যা আর সত্যের  বিচার জ্ঞান প্রখর ছিল। আমার নিজের থেকে ধারণা হয়েছিল রামায়ণ মহাভারত শিক্ষার পুস্তক। এই শিক্ষার জন্যে গুরুর প্রয়োজন নেই।

মা ও বাবা সমালোচনা করতো না। আমার বোনেরা মিথ্যে আর সমালোচনায় মত্ত থাকতো । মার্ এইসব বদ গুন্ ছিল না। মাকে  কখনো হিংসা করতে দেখিনি। আমার বোনেরা ঝগড়ুটে হিংসা পরায়ণ এবং হিংস্র ছিল।

বাবা ৭৩ এ মা গিয়েছিলো। বাবা ৭১ এ এম সাথে শিলং থেকে এসেছিলো। বাবা লুঙ্গি পরে রাতে রাতে পায়ে হেটে বন্ধুদের সাহায্যে অগাতলা পৌঁছেছিল। সঙ্গে এক বান্ডিল টাকা ছিল। সে টাকা আর কাজে লাগেনি। মা কাজে লাগাতে দেয়নি। বাবা আবার বাংলাদেশ হবার পর এক বারের জন্যে ফেরত যেতে চেয়ে ছিল জমি জমা এসবে ব্যবস্থা কোনো। মা আর যেতে দেয়নি। হয়তো এটাই বাবা হিড আগে কারণ। এবং হঠাৎ মৃত্যু। সোনাদা আর সব মতন চেয়েছিলো এক্সচেঞ্জ করতে। মা একটুও মত  দেয়নি। বাঁচা জন্যে এখনই যথেষ্ট বাংলাদেশের জমি বা ব্যবসা ছারাই।

বাবা মারা যাওয়ার পর আমরা গোপাল লাল ঠাকুর রোড এ গিয়েছিলাম। আমার তখন স্কলারশিপ ২৫০ টাকা। কিছুটা সচ্ছলতা ছোড়দির বিয়ে হয়েছে। তখন কাককু প্রায়ই মার্ কাছে গল্প করতে আস্ত। তারপর আমি চাকরি নিয়ে বারোদা চলে যাই। মাকে কখনো কাকু কাকিমার সম্বন্ধে খারাপ কিছু বলতে শুনিনি। মা কারোর সমন্ধে খারাপ বলা পচ্ছন্দ করতো না।

Comments

Popular posts from this blog

উত্তর খণ্ড ~ নির্বাসন

নাম মাহাত্য

আমি নেই